নতুন খবর রিপোর্ট
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় পাঁচ বছর আগে মাসুদ রানা (৪৫) নামে এক ইতালি প্রবাসী ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইমদাদুল হক বাচ্চুকে (৬০) প্রধান আসামি করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে নিহতের পরিবার। তদন্ত শেষে ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করে পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
আদালতে ওই মামলার বিচারকাজও চলছে। কিন্তু সেই হত্যা মামলাকে ‘রাজনৈতিক মামলা’ ভুক্ত করে তা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোদাররেছ আলী ইছা।
এ বছরের ৮ এপ্রিল মামলাটি জেলায় ‘বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে করা হয়রানিমূলক মামলাসমূহ প্রত্যাহারসংক্রান্ত যাচাই-বাছাই কমিটি’র সর্বসম্মতিক্রমে মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশের জন্য চূড়ান্ত করা হয়।
গত ২৩ এপ্রিল ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা (সম্প্রতি বদলিকৃত )স্বাক্ষরিত সেই সুপারিশপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ তোলেন নিহত মাসুদ রানার পরিবার।
এ সময় হত্যা মামলার নথিপত্র ও রাজনৈতিক মামলা হিসেবে তা প্রত্যাহানেন আবেদনপত্রসহ বিভিন্ন তথ্য সাংবাদিকদের জানান।
এ সংবাদ সম্মেলনে মাসুদ রানার বৃদ্ধ মা হালিমা বেগমের (৭৫) পক্ষে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান তাঁর ছোট ছেলে আসাদুজ্জামান ( নিহত মাসুদ রানার ছোট ভাই )।
এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নিহত মাসুদ রানার স্ত্রী শাহীন আফরোজ রোজা ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে মাসুদা মেহেরুবাসহ পরিবারের সদস্যরা। এই পরিবারটি ভাঙ্গা উপজেলার হামিরদী ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের বাসিন্দা।
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ২০০৪ সাল থেকে ১৮ বছর ধরে মাসুদ রানা ইতালিতে বসবাস করেন।
২০১৭ সালে স্ত্রী ও দুই সন্তানকেও তিনি সেখানে নিয়ে যান।
পরে ২০২১ সালে দেড় মাসের ছুটিতে দেশে আসেন মাসুদ রানা।
ওই সময় গ্রামে দুই পক্ষের বিরোধ মেটাতে মাসুদ রানা উদ্যোগ নেন। এতে গ্রাম্য মোড়ল ও পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইমদাদুল হক বাচ্চুর অনুসারীরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৩ এপ্রিল রাতে ভাঙ্গা উপজেলার নওপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দলবল নিয়ে ধারালো অস্ত্র, চাপাতি ও রামদা দিয়ে মাসুদ রানাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় দুই দিন পর ১৫ এপ্রিল ৩৫ জনকে আসামি করে ভাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন মাসুদের মা হালিমা বেগম।
লিখিত বক্তব্যে আরও জানানো হয়, ওই মামলায় একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর হত্যাকাণ্ডের বিবরণ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ধারালো ছোরার ফরেনসিক প্রতিবেদনসহ ৩৪ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. ফরহাদ হোসেন। অভিযোগপত্রে ভাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইমদাদুল হক বাচ্চুর নেতৃত্বে কুপিয়ে জখম করা হয়।

মামলাটি বর্তমানে ফরিদপুরের অতিরিক্ত দায়রা জজের দ্বিতীয় আদালতে বিচারাধীন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য ও তথ্যপত্রে দেখা যায়, আদালতে চলমান মামলাটি চলতি বছর রাজনৈতিক মামলা উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের আবেদন করেন ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী ইছা। এতে তিনি সব আসামির নাম উল্লেখ করেন।
পরে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল জেলায় ‘বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে করা হয়রানিমূলক মামলাসমূহ প্রত্যাহারসংক্রান্ত যাচাই-বাছাই কমিটি’র সর্বসম্মতিক্রমে প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশের জন্য চূড়ান্ত করা হয়।
ওই সুপারিশপত্রে স্বাক্ষর করেন কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা (বদলিকৃত), কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ( এডিএম ) মিন্টু বিশ্বাস, কমিটির সদস্য ও পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আশরাফুজ্জামান নান্নু।
গত ২৩ এপ্রিল ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা স্বাক্ষরিত ওই সুপারিশপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; আইন ও বিচার বিভাগ; আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়; মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে হালিমা বেগম ছেলে হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করে বলেন, সরকারের কাছে আমার দাবি আমি জীবিত থাকতে যেন ন্যায়বিচারটা দেখে যেতে পারি। আমার ছেলের শোকে চার মাস পর আমার স্বামীও স্ট্রোক করে মারা গেছেন।
মামলা প্রত্যাহারের আবেদনকারী ও ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী ইছা বলেন, কেউ ভালো-মন্দ বলতেই পারেন। আবেদনের পরে এটা আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তো আর সারা দেশের মানুষ চিনি না।
মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বাদি পক্ষের আইনজীবী মো. শফিউদ্দিন মুন্সী বলেন, আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্র অনুযায়ী মামলাটি বিচারকাজের জন্য অভিযোগও গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে অন্তত ১৩ জনের সাক্ষ্য নিয়েছেন আদালত। এই মামলা কোনোভাবেই রাজনৈতিক হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না।
“বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে করা হয়রানিমূলক মামলাসমূহ প্রত্যাহারসংক্রান্ত যাচাই-বাছাই কমিটির ” সদস্য সচিব ও ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মিন্টু বিশ্বাস জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রথমে একটি লোকাল (স্থানীয়) তদন্ত হয়েছে। পরে পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশপত্র পাঠানো হয়েছে। পরিবারটি যদি প্রথম দিকে আমাদের জানাত। তাহলে আমরা ফের তদন্তে পাঠাতাম। এখন তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আপত্তি জানাতে পারেন এবং আপত্তি অনুযায়ী ফের তদন্তে দেওয়া হলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।