নতুন খবর রিপোর্ট
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুরের চারটি আসনের ভোটযুদ্ধে প্রার্থীরা মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
ফরিদপুরের রাজনীতিতে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) অনুপস্থিতিতে ভোটে যেমন নতুন মুখ এসেছে।
তেমনি প্রচার-প্রচারণায় পুরোদমে মাঠে কাঁপাচ্ছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সম্ভাব্য নির্বাচনের তারিখ ধরে শুরু হয়ে গেছে জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন ফরিদপুর-৩( সদর) এর নির্বাচনী প্রচার ও প্রচারণা।
দেশ ও জাতির বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ও রাজনীতির জনপদ খ্যাত এ জেলার সদর আসনের গুরুত্ব অনেক।
অনেক ভোটারের বিশ্বাস ফরিদপুর সদর আসনে যে দলের প্রার্থী বিজয়ী হন। সেই রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসীন হয়।
সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা পুরোদমে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।
প্রার্থীরা নিয়মিত গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ করে নির্বাচনী মাঠ গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বিএনপি ও জামায়াত এই দুই দলের প্রার্থীই প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন।
প্রার্থীরা তাদের দলের প্রতীক সম্বলিত ব্যানার ফেস্টুন দিয়ে শহরের বিভিন্ন গুরুত্ব মোড় ও সড়ক এলাকা সাজিয়ে তুলছেন।
শহরাঞ্চলের পাশাপাশি
গ্রামের চায়ের স্টলগুলোতেও নির্বাচনী আমেজ বইছে।
ফরিদপুর-৩ (সদর) এই গুরুত্বপূর্ণ আসনটিতে ১৯৭৯ সাল থেকে ২০০১সালের নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রয়াত ভাইসচেয়ারম্যান ও সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ।
এবার ভিন্ন পরিবেশে প্রয়াত চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের মেয়ে ও মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী নায়াব ইউসুফ প্রথমবারের মতো এ আসনে নির্বাচন করছেন।
এ ছাড়া জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও ফরিদপুর অঞ্চল টিমের সদস্য প্রফেসর আবদুত তাওয়াব, খেলাফত মজলিসের জেলা সভাপতি মাওলানা আমজাদ হোসাইন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব মুফতি কামরুজ্জামান, ইসলামী আন্দোলনের ফরিদপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কে এম সারোয়ার, সিপিবির কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রফিকুজ্জামান, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফ হাসান খানঁ(সাকিব), স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক এমপি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের আজাদ ও প্রবাসী শক্তি ডি গুপ্তা প্রার্থী হিসেবে মাঠে তৎপর আছেন।
বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে দুটি আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফরিদপুরে জাতীয় পার্টির (জাপা) কার্যক্রম নেই বললেই চলে। নির্বাচন নিয়ে দলটির নেতাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রার্থী প্রয়াত ইমামউদ্দীন আহমাদ নির্বাচিত হয়েছিলেন।
পরে ১৯৭৯ সাল থেকে পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে কিএনপির প্রার্থীই বিজয়ী হয়েছেন।
ব্যতিক্রমও আছে।
এরশাদ আমলের ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বিজয়ী হন।
এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটিতে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন আওয়ামীলীগের ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামীলীগ প্রার্থীকে হারিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল কাদের আজাদ বিজয়ী হন।
তবে এ আসনে বিএনপি নেতা প্রয়াত চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ এই জনপদের মানুষের কাছে এক জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধার নাম।
তিনি যতদিন নির্বাচন করেছেন তাকে মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন।
এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন ঐতিহ্যবাহী পরিবারের মেয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রয়াত চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের মেয়ে ও মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী নায়াব ইউসুফ। তিনিও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে দিন রাত ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। প্রচার-প্রচারণাতে এগিয়ে চলেছেন।
এদিকে সদর এই আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী হিসাবে রয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও ফরিদপুর অঞ্চল টিমের সদস্য প্রফেসর আবদুত তাওয়াব।
তিনি সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।তাকেও দলীয় নেতা,কর্মী ও সমর্থকরা প্রচারণায় এগিয়ে রাখছেন।
এবারে জামায়াতের সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো দাবি করছেন।
এরই মধ্যে প্রার্থীর পক্ষে দলীয় আমীর ও নায়েবে আমীর দুটি জনসভা করে ভোট চেয়েছেন। এছাড়া জামায়াতের প্রার্থী প্রফেসর আবদুত তাওয়াব ও তার কর্মীরা ভোটের মাঠে নিরলসভাবে কাজ করছেন।
এ আসনটি ঘিরে ভোটারদের প্রত্যাশাও বেশি।
তাই এ আসনে বিএনপির সাথে জামায়াত প্রার্থীর দ্বিমুখী লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ আসনে সাবেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আবদুল কাদের আজাদ নির্বাচন করবেন বলে তার ঘনিষ্টজনরা জানান দিয়েছেন। প্রথম দিকে জোরে-শোরে প্রচারণায় থাকলেও বর্তমানে তাকে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না।
ভোটারদের বিরাট একটি অংশের ধারণা আবদুল কাদের আজাদ শেষ পর্যন্ত যদি নির্বাচন করেন তবে সেক্ষেত্রে এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের তীব্র সম্ভবনা রয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি’র প্রার্থী চৌধুরী নায়াব ইউসুফ বলেন, এ আসনটি বিএনপির ঘাঁটি। বিগত দিনে আওয়ামীলীগ বিতর্কিত নির্বাচন করে আসনটি তাদের দখলে রাখলেও এবার মানুষ বিএনপির প্রার্থীকেই ভোট দেবে। আমার বাবা সব সময় মানুষের জন্য কাজ করেছেন। আমিও আমার বাবার মতো মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে চাই। এবার সেই সুযোগ এসেছে। এই আসনের ভোটাররা আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। আমি যদি নির্বাচনে বিজয় লাভ করতে পারি তাহলে এ আসনের মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখব। এছাড়া নারীদের কর্মসংস্থান সহ এ অঞ্চলের শিল্পায়ন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে আমার।
ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব একেএম কিবরিয়া স্বপন বলেন, আমরা শুধু দলের মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই কাজ শুরু করি নাই। তার আগে থেকেই চৌধুরী নায়াব ইউসুফের জন্য কাজ করছি। আমরা আমাদের প্রার্থী নিয়ে বহু দিন থেকেই কাজ করছি এবং ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আমরা পৌরসভা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন সহ সব জায়গায় আমরা আমাদের কার্যক্রম এবং প্রচার-প্রচারণা চলমান রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর আমাদের প্রচার-প্রচারণা গতি আরও বাড়বে। আমরা এবারের নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। এ আসনের মানুষ ১৭ বছর ভোট দিতে পারেনি। এবার মানুষের সেই সুযোগটা এসেছে। তারা বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে চায়।
চৌধুরী নায়াব ইউসুফ ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী পরিবারের সন্তান। তার বাবা এবং পরিবারের একটি ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা রয়েছে জেলায়।
এদিকে জামায়াত প্রার্থী আবদুত তাওয়াব বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ভোটাররা এবার তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন।
তিনি বলেন, এবার সুযোগ এসেছে মানুষের ইসলামী দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করার। আমরা জনগণের কাছে গিয়ে ভোট চাচ্ছি। আশা করি আমরা ভালো ফলাফল নিয়ে আসতে পারব। বিজয়ের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী।
ফরিদপুর জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, আমরা সদর আসনে ভোট চাওয়া এবং দাওয়াতি কার্যক্রম অনেকদিন আগ থেকেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা বসে নেই আমরা প্রতিনিয়তই ভোটারদের কাছে যাচ্ছি। আমরা শুধু নির্বাচন নিয়ে কাজ করি না আমরা সবসময়ই জনগণের কাছে যায়। তাদের সাথে সব সময় আমাদের যোগাযোগ রয়েছে।
আমাদের প্রার্থী সম্বন্ধে সকলেই জানেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন একজন মানুষ। তিনি একটি কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সৎ এবং ভালো মানুষ হিসেবে তিনি ব্যাপক পরিচিত ফরিদপুরে। আমরা এ আসনে জয়ের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। আমরা মাঠে যে কাজ করছি সেখানে ব্যাপক পরিমাণে সাড়া পাচ্ছি বলে তিনি জানান। সাধারণ মানুষ আমাদেরকে ব্যাপক সাড়া দিচ্ছে। ইনশাল্লাহ এবার আমারা জয়ী হতে পারব।
ফরিদপুরের সাবেক এমপি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল কাদের আজাদ বলেন, ফরিদপুরে বর্তমানে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নেই। লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। তবে আমি আশাবাদী, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হলে এ পরিস্থিতির অবসান হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমি বিজয়ী হব।
ফরিদপুর-৩ (সদর) নিয়ে গঠিত আসনটিতে মোট ভোটার চার লাখ ৬৪ হাজার ৮৩৪ জন। গত ২০০৮ সালের পরে এই আসনে আওয়ামী লীগ তিনবার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার বিজয়ী হয়। এর আগে সবসময়ই আসনটি বিএনপির আসন হিসেবে পরিচিত ছিল। এবার হাত ছাড়া হওয়া এই আসনে বিএনপি বিজয়ী হবে বলে ভোটারদের অনেকের ধারণা।