নতুন খবর রিপোর্ট
“আমি আমার সন্তানের জন্য বাঁচতে চাই উন্নত চিকিৎসা চাই” এ আকুতি এক সন্তানের মা বীথি আক্তারের(২৩)। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এভাবেই বাঁচার আকুতি জানালেন তিনি।
প্রায় পাঁচ মাস আগে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের পর তার পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেন চিকিৎসক।
দুই মাস পর দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারে ওই গজ কাপড় পেট থেকে বের করা হলেও বর্তমানে আশঙ্কাজনক ওই প্রসূতি।
প্রসূতি বীথি আক্তার রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যোতিনবর্দিপাড়া গ্রামের রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী এবং ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী।
বর্তমানে তিনি মরণাপন্ন অবস্থায় ওই হাসপাতালের চতুর্থ তলায় গাইনি বিভাগে ভর্তি।
জীর্ণ শরীরে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন বীথি আক্তার। তার পাশে অসহায় মা মনোয়ারা বেগমসহ স্বজনরা ৷
তারা বলেন, ধীরে ধীরে বীথির শরীর কঙ্কালসার হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া হার্ট ব্লক, উচ্চ রক্তচাপ, শরীরে কাঁপুনিসহ নানা উপসর্গ দেখা দিয়েছে। উন্নত চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রতিদিনই স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে।
বিছানায় শুয়েই শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি হাতজোড় করে বাঁচার আকুতি জানান বীথি আক্তার।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। আমি আমার সন্তানের জন্য বাঁচতে চাই।
বীথির স্বজনরা জানান, গত ৬ মে ওই হাসপাতালে বীথির অস্ত্রোপচার করেন চিকিৎসক তামান্না আক্তার ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দু। ওই সময় এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন তিনি। এর পাঁচ দিন পরে হাসপাতাল ছেড়ে স্বামীর বাড়ি যান বীথি।
এর পর থেকে বীথির শরীরে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।
চিকিৎসক ‘গুরুতর কোনো সমস্যা হয়নি’ বলে তাঁকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।
কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে প্রায় দেড় মাস পর দুটি আলাদা বেসরকারি হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রামে দেখা যায়, তার পেটের মধ্যে গজ রয়েছে।
পরে গত ১২ জুলাই ফমেক হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় বীথিকে। ১৫ জুলাই সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হক শোভন ও সঞ্জয় সাহা দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার করে গজ কাপড় বের করে আনেন। তত দিনে তার পেটের নাড়ি পচে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। এরপর অস্ত্রোপচারকারী তামান্না আক্তারকে ডেকে ৪০ হাজার টাকায় আপস করা হয় এবং পরে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য জোর করে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পরিবারের সদস্যদের।
গত ২২ জুলাই বীথিকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে পেটে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ফের ২০ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন বীথি। ওই দিনেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই সময় চার দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তাঁর চিকিৎসা চলে। এর পর থেকে হাসপাতালটির গাইনি বিভাগে ভর্তি বীথি।
বীথির মা মনোয়ারা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, চিকিৎসকের ভুলে আমরা দুটি পরিবারই নিঃস্ব হয়ে গেছি। কেউ এসে দেখলও না। এখন আর ডাক্তাররাও গুরুত্ব দিচ্ছে না। মেয়ের অবস্থা ভালো না। ভালো চিকিৎসা না পেলে যেকোনো সময় মারা যেতে পারে। আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমার মেয়েকে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। আমার মেয়েকে বাঁচান।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত পরিচালক) মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু জানান, এ ঘটনায় ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি এবং সুচিকিৎসার জন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, পেটে গজ কাপড় রেখে সেলাই নয়। অস্ত্রোপচারের কারণে সংক্রমণ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা জেনেছি, সংক্রমণের কারণে জটিলতা সৃষ্টি ও হার্টব্লকসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক তামান্না আক্তারের বক্তব্য পাওয়া যায় নি। তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।