নতুন খবর রিপোর্ট
ফরিদপুর জেলায় গত একমাসে সাতটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।
এসব নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে শিশু, নারী, রিকশা চালক, মাছ ও ডাব ব্যবসায়ী।
এছাড়া গণপিটুনিতে একজন নিহত হয়েছে। গত ২০ নভেম্বর থেকে চলতি মাসের ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে পাঁচটিই ছিল ক্লুলেস।
এর মধ্যে একটি হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন হয়েছে। অপর হত্যাকান্ডগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশে জানিয়েছে।
এছাড়া মাত্র দুটি ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অপর ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একজনকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ বলেছে, গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। শিগগিরই রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে পুলিশ আশাবাদী।
আলফাডাঙ্গায় শিশু হত্যাঃ
গত ২০ নভেম্বর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামের গ্রিস প্রবাসী পলাশ মোল্লার সাত বছরের ছেলে জায়ান মোল্লার মরদেহ বাড়ির পাশের বাগানের একটি গাছ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটির মুখে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া ছিল। ঝুলন্ত অবস্থায় তার পরনের প্যান্ট দিয়ে মুখমন্ডল ঢাকা ছিল।
এ নির্মম হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে এলাকাবাসী জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
এ ঘটনায় তার মা সিনথিয়া বেগম অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ সুত্রে জানা যায়, ঘটনার পর ২৫ নভেম্বর প্রতিবেশী ইউনুচ মোল্লা (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, শিশুটিকে ঝুলিয়ে রাখা রশির (দড়ি ) সুত্র ধরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক সুজন বিশ্বাস তার সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
গত ১০ ডিসেম্বর ফরিদপুর ৯ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক আনারুল আসিফ এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা সুজন বিশ্বাস জানান, তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
নারীর হাত বাধা বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার:
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলা থেকে অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) বেলা ১১ টার দিকে পুলিশ সদরপুর উপজেলার সাবরেজিষ্ট্রি অফিস সংলগ্ন সড়ক থেকে অজ্ঞাত পরিচয় নারীর হাত বাঁধা বিবস্ত্র মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা। পরে ৯৯৯ এ কল পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় ওই রাতেই পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে মরদেহটির পরিচয় শনাক্ত করে বলে নিশ্চিত করেন তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুজ্জামান রিপন। মরদেহটি বোয়ালমারী উপজেলার সোতাশী গ্রামের বারিক শেখের মেয়ে রুমা বেগমের (২৫)।
এ ঘটনায় শনিবার (২০ ডিসেম্বর) সকালে মৃতের স্বামী তুহিন মন্ডল বাদি হয়ে অজ্ঞাতানামাদের আসামী করে থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, এই নারী মানসিক ভারসাম্য ছিলেন এবং মাঝে মধ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন। সর্বশেষ গত ১৫ ডিসেম্বর বাড়ি থেকে বের হয়ে নিঁখোজ ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকান্ডটি কিভাবে ঘটেছে তা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে জানা যাবে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে কি-না সে বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ওইদিন সন্ধ্যায় ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়নের গুনপালদী গ্রামে টুকু মোল্লা (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে বটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে সীমা বেগম নামে এক নারীর বিরুদ্ধে। সীমা বেগম নিহতের চাচাতো ভাই তুরস্ক প্রবাসী সোহাগ মোল্লার স্ত্রী এবং ঘটনার পর সে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় শনিবার (২০ ডিসেম্বর) নিহতের স্ত্রী আমেনা আক্তার থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানিয়ে ওসি মো. আলীমুজ্জামান বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন ।
অপরদিকে এই ঘটনার আগের দিন বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) সকালে ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈশানগোপালপুর ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের একটি কলাবাগান থেকে টিপু সুলতান (৪০) নামে এক রিকশাচালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দুর্বৃত্তরা তাকে গলাকেটে হত্যার পর ব্যবহৃত রিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই সিদ্দিক শেখ বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামী করে কোতয়ালী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক হীরামন বিশ্বাস বলেন, এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে । এছাড়া তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
দুর্বৃত্তদের হামলায় মাছ ব্যবসায়ী নিহত:
গত ৫ ডিসেম্বর ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর মাছের আড়তে যাওয়ার পথে জেলার সালথার কালীতলা ব্রিজ (মাটিয়াদহ) এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় উৎপল সরকার (৩৮) নামে এক মাছ ব্যবসায়ী নৃশংসভাবে খুন হন। দুর্বৃত্তরা প্রথমে উৎপলের সাথে থাকা ভ্যানচালক ফিরোজ মোল্লাকে চোখ বেঁধে ব্রিজের রেলিংয়ে বেঁধে ফেলে এবং পরে উৎপলকে কুপিয়ে হত্যা করে।
এ ঘটনার রহস্য উদঘাটনসহ জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঘটনার পরদিন নিহতের বাবা জেলা সদরের কানাইপুর ইউনিয়নের রনকাইল গ্রামের অজয় বিশ্বাস হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার দিন দুর্বৃত্তদের ব্যবহৃত ব্যাটারীচালিত ইজিবাইক চালক রাজন মোল্লাকে(৩০) সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয় বলে থানা পুলিশ জানায়।
সে নিহত উৎপলের পাশের তেঁতুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা।
তাঁর দেওয়া তথ্যমতে গত ১৩ ডিসেম্বর একই গ্রামের ফিরোজ মাতুব্বর (৪৫) ও ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সাভার থেকে জাফর মাতুব্বরকে (৪২) গ্রেপ্তার করে র্যাব।
আসামীরা পূর্ব শত্রুতা ও পরকীয়ার জেরে উৎপল সরকারকে হত্যা করে বলে জানান সালথা থানার ওসি মো. বাবলুর রহমান খান।
তিনি বলেন, নিহত উৎপলের সাথে এক আসামীর স্ত্রীর পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। সেই জেরে হত্যা করে। ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ডাব ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধারের একমাসেও মিলেনি রহস্য:
গত ২২ নভেম্বর বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর এলাকার একটি ব্রিজের পাশে ইব্রাহিম (৩৫) নামে এক ডাব ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার সময় অজ্ঞাত অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও পরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত হয়।
তিনি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গোয়ালমারী ইউনিয়নের উত্তরটিলি গ্রামের আব্দুর রহিমের ছেলে। এ ঘটনার পরদিন নিহতের ভাই ফরহাদ হোসেন বাদি হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে একমাস পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকান্ডের রহস্য মিলে নি।
থানার ওসি আনোয়ার হোসেইন বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এছাড়া গত ২৩ নভেম্বর গভীর রাতে চোর সন্দেহে এলাকাবাসীর গণপিটুনিতে নিহত হয় শাহীন শিকদার (২৮) নামে এক যুবক এবং আহত হয় আরও তিন যুবক।
ঘটনাটি জেলার নগরকান্দা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের দেবীনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শাহীনের বাড়ি পাশের গজগাহ গ্রামে। সে ওই গ্রামের মোস্তফা শিকদারের ছেলে। এ ঘটনায় শতাধিক অজ্ঞতানামা আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের মা রিক্তা বেগম। তবে ঘটনার একমাসেও কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক ইরানুল ইসলাম।
এসব হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন ও অগ্রগতি নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শামসুল আজম বলেন, ইতোমধ্যে আমরা সালথার একটি ঘটনার রহস্য উদঘাটনসহ জড়িতদের গ্রেপ্তার করেছি। আলফাডাঙ্গায় শিশু হত্যার ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আমরা আশাবাদী খুব শিগগিরই এসব হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনসহ জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।