• বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১০ অপরাহ্ন
শিরোনাম
কুয়েতে বাংলাদেশী শ্রমি‌কের রহস্যজনক মৃত্যু মধুখালী‌তে পু‌লিশ সুপার বল‌লেন নি‌র্বাচ‌নে স‌হিংসতা নয় ফরিদপুরে যান জট ‌ঠেকা‌তে ইজিবাইক-অটো রিকশার রঙ বদলাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনঃ ফরিদপুরে কোটিপতি চার প্রার্থী, আয় বেশি বিএনপির বোয়ালমারীতে ট্রেনের ধাক্কায় পিকআ‌পের তিন শ্রমিক নিহত, আহত ৯ ফরিদপুরে আইনশৃঙ্খলা ক‌মি‌টির সভায় নির্বাচন প্রস্তুতি, ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত প‌রিচালনার সিদ্ধান্ত সালথায় যুবলীগ নেতা গ্রেপ্তার ফরিদপুরে নিষ্ক্রিয় করা হলো শক্তিশালী বোমা ফরিদপুরে পরিত্যক্ত ব্যাগ থেকে বোমা সাদৃশ্য বস্তু উদ্ধার বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে উরস শরীফ শুরু কাল থে‌কে

মূল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরে ফরিদপুরে প্রথম আলো ট্রাস্টের কম্বল বিতরণ “আইজ এই কম্বল পাইয়া মনে অইছে, রাইতে ঘুমডা আরামের হবেনে” 

Reporter Name / ৬৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬

নতুন খবর রিপোর্ট

কম্বল বিতরণের এ জার্ণিটা ছিল ঘটনাবহুল এবং বিপদ সংকুল। ফরিদপুর থেকে সদরপুরের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল দিয়ারা নারকেল বাড়িয়া ইউনিয়ন। ফরিদপুর থেকে সড়ক এবং নৌপথ ছাড়া ওই এলাকায় যাওয়া সম্ভব নয়। সড়ক ও নৌপথ মিলে ফরিদপুর থেকে দূরত্ব কমপক্ষে ৫৭ কিলোমিটার।

দুর্গম এলাকায় অবস্থানের কারনে এ এলাকার লোকদের খবর মূল ভুখন্ডের মানুষ কমই রাখেন। এমই একটি প্রত্যন্ত এলাকা আমার ফরিদপুর বন্ধুসভা বেছে নেই প্রথম আলো ট্রাস্টের কম্বল বিতরণের স্পট হিসেবে।

কাক ডাকা ভোরে অমরা সকলে বেরিয়ে পরি। আজ ছিল ফরিদপুরের সবচেয়ে শীতার্ত দিন। তাপমাত্রার পরদ নামতে নামতে নয় দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেটে। এর পরিস্থিতির মধ্যে জুবুধুবু হয়ে আমরা বের হয়ে প্রথমে যাই ফরিদপুর বাজারের কাপুড়িপট্টি এলাকায়। সেখান থেকে কম্বলগুলি নিয়ে একটি লেগুনায় করি যাত্রা শুরু করি সদরপুরের শয়তানখালী ঘাট পদ্মা নদীর তীরে। সেখান থেকে ট্রলারে করে দুই ঘন্টা পর পৌছাই আমাদের গন্তব্য দিয়ারা নারকেল বাড়িয়া গ্রামের নন্দলালপুর খেয়াঘাটে। সেখানে আগে থেকে স্লিপ হাতে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন কম্বল নিতে আসা দুস্তজনগোষ্ঠি।

 

 

“নদী ভাঙনের শিকার হইছি কয়েকবার। শীত নামলে আমাগেরে জীবন থাইমা যায়। রাইতে ঘুম অয় না, গাও ঠান্ডায় শক্ত হইয়া যায়, কালাইয়া আসে। ঘরে আলো নাই, পাটখড়ির বেড়ার ফাহা দিয়া বাতাস ঢুইকে পড়ে। পুরান কাপড় দিয়া কত আর ঢাকমু? আইজ এই কম্বল পাইয়া মনে অইছে, রাইতে ঘুমডা আরামের হবেনে।

প্রথম আলো ট্রাস্টের কম্বল হাতে পেয়ে পরম মমতাভরা মুখে এ কথাগুলো বলেন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নুরুদ্দিন সরদারেরকান্দি গ্রামের বাসিন্দা রাহেলা বিবি (৮৭)।

শুধু রাহেলা বেগমই নয়, প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল দিয়ারা নারকেল বাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ২৩৫ জন হত দরিদ্র শিশু-নারী ও পুরুষ-বৃদ্ধের হাতে কম্বল তুলে দেয় প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা।

কম্বল হাতে পেয়ে কুদ্দুস মোল্লারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মুনছুরা খাতুন (৮৩) বলেন, আমি তো এহন ঠিকমতো দাঁড়াইতেও পারি না। শীত আইলে হাঁটু ব্যাথা করে, বুক ধইরা আসে। আগুন জ্বালাইয়া গা সেঁকি, তাও ঠান্ডা যায় না। আজ কম্বলটা পাইয়া আল্লাহরে ডাক দিছি। আইজ কম্বলডা নিচি দিলে ওম হবেনে। যারা আইসা দিছে, আল্লাহ যেন তাদেরে সুস্থ রাহে।

শিকদারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা হালিমা বেগম (৫৪) বলেন, এই চরে থাকলে মানুষরে মানুষ মনে করে না অনেকেই। আপনারা আগে আমাগো খোঁজ নিছেন, পরে ঠিক মতো কম্বল দিছেন। এইডা আমাগের কথা কোনদিন ভুলবো না।

দর্জিকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আমেনা বিবি (৮৯) বলেন, শীত আইলে বুকডা ফাডে। রাইতে ঠান্ডায় ঘুম অয় না। আইজ এই কম্বল পাইয়া চোখে পানি আইছে। মনে হইছে আমরা এখনো মইরা যাই নাই, তোমাগো মত কেউ আমাগো কথা ভাবে। আইজ কম্বলটা পাইয়া মনে হইতেছে এই শীতটা ভাল কাটবেনে।

খলিফাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মতলেব শেখ (৮১) বলেন, শীত আইলে বুড়া শরীর একদম নরম অইয়া যায়।কম্বলডা কামেই লাগবেনে।

সরকার কান্দি গ্রামের বাসিন্দা সোহেল ফরাজী (৪২) বলেন, শীতে বাচ্চাগো কষ্ট দেইখা বুক ফাইটে যায়। আজ কম্বল পাইয়া মনে হইতেছেএই শীতে অন্তত একটু শান্তি পাইমু। ফরিদপুর থেইকা আইসা আমাদের পাশে দাঁড়াইছেন এইটা আমরা কোনোদিন ভুইলমু না।

উল্লেখিত গ্রামগুলি ছাড়াও ওই ইউনিয়নের মোল্লাকান্দি, দাফাকান্দি, মাদবরকান্দি, নন্দলালপুর, আদু মোল্লার ডাঙ্গীসহ ১৪ টি গ্রামের বাসিন্দাদের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়।

কাক ডাকা ভোরে ফরিদপুর থেকে লেগুনায় কম্বলগুলো নিয়ে সদরপুরের শয়তান খালি ঘাট এলাকায় যায় বন্ধুসভার সদস্যরা। সেখান থেকে ট্রলারে করে পদ্মা নদী পাড় হয়ে কম্বল বিতরণের স্থান সদরপুরের দিয়ারা নারকেল বাড়িয়া ইউনিয়নের নন্দলালপুরে খেয়া ঘাটে এসে থাকে ট্রলারটি।

এই ইউনিয়নটি সম্পুর্ণ বিচ্ছিন্ন মূল ভূখণ্ড থেকে।নদীতে নৌকা বা ট্রলার ছাড়া এখান থেকে বের হওয়ার উপায় নেই।এখানে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার বাসিন্দা বাস করে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন দিয়ারা নারকেল বাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন।

তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নটি ফরিদপুরের মধ্যে দূর্গম একটি ইউনিয়ন। এই শীতে সরকারিভাবে যে কম্বল আসে তা দিয়ে এখানকার চাহিদা মিটে না। প্রথম আলো এখানে কম্বল বিতরণের জন্য বেছে নেওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানাই। পাশাপাশি আমি এটা বলতে চাই যে এই কম্বলগুলা সত্যিকারের অভাবী মানুষ পেলো। এই দুর্গম এলাকায় কোনও ব্যাক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে কম্বল বিতরণ হয় না। এ এলাকাটি মূল ভুখন্ড থেকে এত দূরে যে ঘন্টা ট্রলার পাড়ি দিয়ে এখানে কেউ আসে না।

ভোর থেকে দুপুর পযন্ত ফরিদপুর শহরের কাপুড়িপট্টি থেকে, ব্রহ্ম সমাজ সড়কে অবস্থিত নিজস্ব প্রতিবেদকের কাযালয় হয়ে লেগুনায় সদরপুরর শয়তানখালী পযন্ত যাওয়া এর পর ট্রলারে দুই ঘন্টা পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে দিয়ারা নরকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নন্দলালপুর খেয়া ঘাটে গিয়ে দুস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ কম্বল বিতরণে যারা সক্রিয় ভাবে ভুমিকা রেখেছেন তারা হলেন, প্রথম আলো ফরিদপুর বন্ধুসভার সভাপতি জহির হোসেন, সহ-সভাপতি মানিক কুণ্ডু, সাধারণ সম্পাদক সুব্রত পাল, অর্থ সম্পাদক শুভ বিশ্বাস, ক্রীড়া সম্পাদক শ্যামল মন্ডল, পাঠাগার ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক প্রান্ত ঘোষ।

অন্যদের মধ্যে ছিলেন প্রথম আলো ফরিদপুরের আলোচিত্রী আলিমুজ্জামান।

এ কাঝে সহযোগিতা করেছেন সদরপুরের স্বেচ্ছাসেবী মিজানুল রহমান এবং দিয়ারা নারকেল বাড়িয়া ইউনিয়নের দফাদার আবুল হুসাইন।

এর আগে গত ৫ জানুয়ারি প্রথম আলো বন্ধুসভার দুই সদস্য সাধারণ সম্পাদক সুব্রত পাল ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক শ্যামল মন্ডল। ওইদিন তারা দিয়ারা নারকেল বাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দুস্ত ও দুর্গতদের শনাক্ত করে কম্বলের স্লিপ দিয়ে আসেন।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category